রোজা রাখার নিয়ত, রোজার আয়াত ও হাদিস | দোয়া, ফজিলত ও বিস্তারিত আলোচনা

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। এই মাসে রোজা রাখা ফরজ করা হয়েছে। কিন্তু অনেকেই রোজা রাখার নিয়ত, রোজার আয়াত ও হাদিস, এবং রোজার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না।
রোজা-রাখার-নিয়ত

এই পোস্টে আমরা সহজ ভাষায় রোজা রাখার নিয়ত, রোজার আয়াত ও হাদিস | দোয়া, ফজিলত ও বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরব।

পেজ সূচিপত্রঃ রোজা রাখার নিয়ত, রোজার আয়াত ও হাদিস | দোয়া, ফজিলত ও বিস্তারিত আলোচনা

রোজা কী এবং কেন রাখা হয়?

রোজা হলো ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত, যা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও সক্ষম মুসলমানের জন্য পালন করা বাধ্যতামূলক। আরবি ভাষায় রোজাকে “সাওম” বলা হয়, যার অর্থ হলো বিরত থাকা।

অর্থাৎ, ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত শুধু খাওয়া-দাওয়া নয়, বরং সব ধরনের খারাপ কাজ থেকেও নিজেকে বিরত রাখাই হলো রোজা। আল্লাহ তাআলা আল-কুরআন-এ রোজা ফরজ করেছেন, যাতে মানুষ তাকওয়া অর্জন করতে পারে এবং আত্মশুদ্ধি লাভ করে।

ইসলামে রোজা রাখার মূল উদ্দেশ্য হলোঃ
  • আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা
  • আত্মসংযম শেখা
  • তাকওয়া অর্জন করা
  • গরিব মানুষের কষ্ট অনুভব করা

রোজা রাখার নিয়ত

রোজা রাখার জন্য নিয়ত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ত মানে হলো অন্তরের ইচ্ছা।
রোজা রাখার আরবি নিয়তঃ
​نَوَيْتُ اَنْ اَصُوْمَ غَدًا مِّنْ شَهْرِ رَمَضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضًا لَكَ يَا اَللهُ فَتَقَبَّلْ مِنِّيْ اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ

বাংলা উচ্চারণঃ
নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন শাহরি রামাদানাল মুবারাকি ফারদাল্লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম।

বাংলা অর্থঃ
হে আল্লাহ! আগামীকাল তোমার সন্তুষ্টির জন্য পবিত্র রমজান মাসের ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম। অতএব তুমি আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করো, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।

বিঃদ্রঃ তবে মনে রাখবেন, নিয়ত মুখে বলা বাধ্যতামূলক নয়। মনে মনে ইচ্ছা করলেই নিয়ত হয়ে যায়।

রোজা সম্পর্কে কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ আয়াত

রোজা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেনঃ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।”(সূরা আল-বাকারাঃ ১৮৩)

এই আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি-
  • রোজা শুধু আমাদের জন্য নয়, আগের উম্মতের জন্যও ছিল
  • রোজার মূল লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন

রোজা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাদিস

রোজার গুরুত্ব এবং ফজিলত সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদ (সা.) অসংখ্য হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। রোজা এমন একটি ইবাদত, যার প্রতিদান আল্লাহ তাআলা নিজেই প্রদান করবেন এবং এর মাধ্যমে একজন বান্দা আল্লাহর বিশেষ রহমত ও ক্ষমা লাভ করতে পারে।

হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেনঃ
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রোজা রাখে, তার পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” (সহিহ বুখারি)

এই হাদিসের অর্থ হলো, যদি কোনো ব্যক্তি আন্তরিক ঈমানের সাথে এবং শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে রোজা রাখে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার অতীতের ছোট ছোট গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন। এটি একজন মুসলমানের জন্য অনেক বড় সুসংবাদ এবং রমজান মাসের সবচেয়ে বড় ফজিলতগুলোর একটি।

এই হাদিস আমাদেরকে শেখায় যে, রোজা শুধু একটি নিয়ম পালন নয়, বরং এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি বিশেষ সুযোগ। তাই রোজা রাখার সময় আমাদের উচিত সম্পূর্ণ আন্তরিকতা, বিশ্বাস এবং সওয়াবের আশা নিয়ে রোজা পালন করা। কারণ সঠিকভাবে রোজা রাখলে এটি আমাদের গুনাহ মাফের কারণ হয় এবং আমাদের জীবনকে আরও পবিত্র ও সুন্দর করে তোলে।

এছাড়াও রোজা মানুষকে ধৈর্যশীল, সংযমী এবং আল্লাহভীরু হতে সাহায্য করে, যা একজন প্রকৃত মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ গুণ।

রোজার ফজিলত ও গুরুত্ব

রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং এর ফজিলত অনেক বেশি। রমজান মাসে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের জন্য রহমত, মাগফিরাত এবং নাজাতের বিশেষ সুযোগ করে দেন। রোজার মাধ্যমে একজন মুসলমান শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টিই অর্জন করে না, বরং তার জীবন থেকে অনেক গুনাহ মাফ হয়ে যায় এবং সে আল্লাহর আরও প্রিয় বান্দায় পরিণত হয়। নিচে রোজার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো-

১) গুনাহ মাফ হয়
রোজা মানুষের গুনাহ মাফের একটি বড় মাধ্যম। একজন ব্যক্তি যখন সম্পূর্ণ ঈমান এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় রোজা রাখে, তখন আল্লাহ তাআলা তার পূর্বের অনেক গুনাহ ক্ষমা করে দেন।

রোজা মানুষকে খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে এবং ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করে। এর মাধ্যমে একজন মুসলমান তার জীবনের ভুলগুলো বুঝতে পারে এবং নিজেকে সংশোধন করার সুযোগ পায়। তাই রমজান মাসকে গুনাহ মাফের মাস বলা হয়।

২) জান্নাতের দরজা খোলা হয়
রমজান মাস আসার সাথে সাথে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। এর অর্থ হলো, এই মাসে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের জন্য জান্নাতে যাওয়ার পথ সহজ করে দেন।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, রমজান মাসে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, এই মাসে ভালো কাজ করলে তার প্রতিদান অনেক বেশি পাওয়া যায়।

তাই এই সময় বেশি বেশি নামাজ পড়া, কুরআন তিলাওয়াত করা এবং ভালো কাজ করা উচিত।

৩) জাহান্নামের দরজা বন্ধ থাকে
রমজান মাসের আরেকটি বড় ফজিলত হলো, এই মাসে জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ রাখা হয়। এর অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর বিশেষ সুযোগ দেন।

এই সময় মানুষ যদি আল্লাহর কাছে তওবা করে এবং তার ভুলের জন্য ক্ষমা চায়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন। এটি আল্লাহর অসীম রহমতের একটি বড় নিদর্শন।

৪) শয়তান বন্দী থাকে
রমজান মাসে শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। এর ফলে শয়তান মানুষের উপর আগের মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

এই কারণে রমজান মাসে মানুষ সহজেই ভালো কাজ করতে পারে এবং খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে পারে। এই বিষয়টি সহিহ বুখারি হাদিসেও উল্লেখ রয়েছে।

বিঃদ্রঃ এই চারটি বিষয় থেকে আমরা বুঝতে পারি, রমজান মাস এবং রোজা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ রহমত। এই মাসে-
  • গুনাহ মাফ হয়
  • জান্নাতের দরজা খুলে যায়
  • জাহান্নামের দরজা বন্ধ থাকে
  • শয়তান বন্দী থাকে
তাই আমাদের উচিত এই মাসকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো এবং বেশি বেশি ইবাদত করা, যাতে আমরা আল্লাহর রহমত এবং ক্ষমা লাভ করতে পারি।

রোজা রাখার সঠিক নিয়ম

রোজা শুধু না খেয়ে থাকা নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইবাদত। রোজা সঠিকভাবে পালন করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। এই নিয়মগুলো অনুসরণ করলে রোজা শুদ্ধভাবে আদায় হয় এবং আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। নিচে রোজা রাখার গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরা হলো-
রোজা-রাখার-নিয়ত

১) সাহরি খাওয়া
সাহরি খাওয়া রোজার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। সাহরি হলো ফজরের আগে খাওয়া খাবার, যা রোজা রাখার প্রস্তুতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) সাহরি খাওয়ার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়েছেন। কারণ সাহরির মধ্যে বরকত রয়েছে।

সাহরি খাওয়ার উপকারিতা হলোঃ
  • এটি সারাদিন রোজা রাখতে শক্তি দেয়
  • শরীর দুর্বল হওয়া থেকে রক্ষা করে
  • সুন্নত পালন করার সওয়াব পাওয়া যায়
তাই চেষ্টা করা উচিত ফজরের আগে সাহরি খাওয়া এবং খুব বেশি আগে না খেয়ে একটু দেরিতে খাওয়া।

২) নিয়ত করা
রোজা রাখার জন্য নিয়ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ত মানে হলো অন্তরের ইচ্ছা বা সংকল্প করা যে, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখছি।

নিয়ত মুখে বলা বাধ্যতামূলক নয়, বরং মনে মনে ইচ্ছা করলেই নিয়ত হয়ে যায়। তবে নিয়ত করার সময় মনে রাখতে হবে, এই রোজা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য রাখা হচ্ছে। নিয়ত ছাড়া কোনো ইবাদত পূর্ণ হয় না, তাই রোজার আগে নিয়ত করা জরুরি।

৩) খাওয়া-দাওয়া থেকে বিরত থাকা
রোজার সবচেয়ে মূল নিয়ম হলো, ফজরের আযান থেকে শুরু করে মাগরিবের আযান পর্যন্ত সব ধরনের খাওয়া-দাওয়া এবং পান করা থেকে বিরত থাকা। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত-
  • খাবার খাওয়া
  • পানি পান করা
  • ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু খাওয়া বা পান করা
এই সময়ের মধ্যে এসব থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হয় এবং মাগরিবের আযানের সাথে সাথে ইফতার করা হয়। এটি আল্লাহর নির্দেশ পালন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৪) খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা
রোজা শুধু শরীরের জন্য নয়, বরং মন এবং চরিত্রের জন্যও একটি প্রশিক্ষণ। তাই রোজা অবস্থায় সব ধরনের খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি। যেমনঃ
  • মিথ্যা বলাঃ রোজা অবস্থায় মিথ্যা বলা থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ মিথ্যা বলা একটি বড় গুনাহ।
  • গীবত করাঃ অন্যের পিছনে খারাপ কথা বলা গীবত, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। এটি রোজার সওয়াব কমিয়ে দেয়।
  • ঝগড়া করাঃ কারো সাথে ঝগড়া বা খারাপ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
রোজা মানুষকে ধৈর্য এবং সহনশীলতা শেখায়।

রোজা ভঙ্গের কারণ

কিছু কারণে রোজা ভেঙে যায়ঃ
  • ইচ্ছাকৃত খাওয়া-দাওয়া
  • ইচ্ছাকৃত বমি করা
  • সহবাস করা
এই কাজগুলো করলে রোজা ভেঙে যায়।

রোজার গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত

রোজার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত রয়েছে-
রোজা-রাখার-নিয়ত

১) সাহরি দেরিতে খাওয়া
২) সময়মতো ইফতার করা
৩)ইফতারের দোয়া পড়া
  • ইফতারের দোয়াঃ اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ
  • বাংলা উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু
  • বাংলা অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনার জন্য আমি রোজা রেখেছি, আপনার রিজিক দ্বারা ইফতার করছি। (আবু দাউদ, সাওম অধ্যায়)

রোজা রাখার উপকারিতা

রোজা শুধু ধর্মীয় দিক থেকে নয়, শারীরিক দিক থেকেও উপকারী।
 
শারীরিক উপকারিতাঃ
  • শরীর ডিটক্স হয়
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে
  • হজমশক্তি ভালো হয়
মানসিক উপকারিতাঃ
  • ধৈর্য বৃদ্ধি পায়
  • আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখা যায়

রোজা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন ১) নিয়ত না করলে কি রোজা হবে?
হ্যাঁ, মনে মনে নিয়ত করলেই রোজা হয়ে যাবে।

প্রশ্ন ২) সাহরি না খেলে কি রোজা হবে?
হ্যাঁ, হবে। তবে সাহরি খাওয়া সুন্নত।

প্রশ্ন ৩) ভুলে কিছু খেলে কি রোজা ভেঙে যাবে?
না, ভাঙবে না।

প্রশ্ন ৪) রোজা রাখার মূল উদ্দেশ্য কি?
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।

শেষ কথা

রোজা ইসলাম ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সঠিকভাবে রোজা রাখার নিয়ত, রোজার আয়াত ও হাদিস, এবং রোজার নিয়ম সম্পর্কে জানা।

রোজা শুধু না খেয়ে থাকার নাম নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধির একটি মাধ্যম। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে রোজা রাখার তৌফিক দান করুন। আমিন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আপনার মতামত আমাদেরকে সাহায্য করবে আরো সুন্দরভাবে আপনাদের সেবা দেওয়ার জন্যে ।

comment url