জৈব সার কাকে বলে এবং সার ব্যবহারের নিয়ম, টেকসই কৃষির সম্পূর্ণ গাইড

বর্তমান সময়ে কৃষি বলতে শুধু বেশি ফলন নয়, বরং মাটির স্বাস্থ্য, পরিবেশ সুরক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাকেও বোঝায়। এই লক্ষ্য অর্জনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো জৈব সার। রাসায়নিক সারের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে এখন অনেক কৃষক ও সাধারণ মানুষ প্রাকৃতিক পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন। 
জৈব-সার-কাকে-বলে

এই লেখায় আমরা বিস্তারিতভাবে জানব জৈব সার কাকে বলে এবং জৈব সার ব্যবহারের নিয়ম, পাশাপাশি এর উপকারিতা, প্রকারভেদ ও সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি।

পেজ সূচিপত্রঃ জৈব সার কাকে বলে এবং জৈব সার ব্যবহারের নিয়ম, টেকসই কৃষির সম্পূর্ণ গাইড

জৈব সার কাকে বলে?

যে সার সম্পূর্ণভাবে প্রাকৃতিক উৎস থেকে তৈরি হয় এবং মাটির উর্বরতা ও গুণাগুণ উন্নত করে, তাকে জৈব সার বলা হয়। সাধারণত গবাদি পশুর গোবর, গাছের পাতা, খড়, ফসলের অবশিষ্টাংশ, রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য ও বিভিন্ন উপকারী অণুজীবের মাধ্যমে জৈব সার তৈরি করা হয়।

জৈব সারের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি ধীরে ধীরে গাছকে পুষ্টি সরবরাহ করে এবং মাটির ভেতরের উপকারী জীবাণুগুলোকে সক্রিয় রাখে। ফলে জমি দীর্ঘদিন উর্বর থাকে এবং পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না।

যে সার প্রাকৃতিক উৎস থেকে তৈরি হয় এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে, তাকে জৈব সার বলা হয়। এই সার সাধারণত গাছপালা, পশুর গোবর, ফসলের অবশিষ্টাংশ, পচা পাতা, খড়, রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য ও বিভিন্ন উপকারী অণুজীবের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। জৈব সার মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট না করে বরং দীর্ঘমেয়াদে মাটিকে উর্বর ও জীবন্ত রাখে।
জৈব-সার-কাকে-বলে

জৈব সারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি ধীরে ধীরে গাছকে পুষ্টি সরবরাহ করে। এতে থাকা পুষ্টি উপাদানগুলো একবারে নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে মিশে গাছের শিকড়ের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য হয়। এর ফলে গাছ শক্তভাবে বেড়ে ওঠে এবং ফসলের গুণগত মান উন্নত হয়।

জৈব সার ব্যবহারে মাটির উপকারী অণুজীব সক্রিয় থাকে। এই অণুজীবগুলো মাটির ভেতরে পুষ্টি উপাদান ভেঙে গাছের জন্য সহজলভ্য করে তোলে। ফলে মাটির উর্বরতা প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং জমি দীর্ঘদিন চাষের উপযোগী থাকে।

রাসায়নিক সারের তুলনায় জৈব সার পরিবেশবান্ধব। এটি মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ করে না এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ রেখে যায় না। এজন্য নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে জৈব সারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জৈব সার কেন গুরুত্বপূর্ণ?

রাসায়নিক সার স্বল্প সময়ে ফলন বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে মাটির গঠন নষ্ট করে। অন্যদিকে জৈব সার মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়িয়ে জমিকে জীবন্ত রাখে। জৈব সার ব্যবহারের ফলে-
  • মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়
  • মাটির উর্বরতা দীর্ঘদিন বজায় থাকে
  • ফসলের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ উন্নত হয
  • পরিবেশ দূষণ কমে
এই কারণেই টেকসই কৃষির জন্য জৈব সার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

বর্তমান কৃষিতে শুধু বেশি ফলন পাওয়াই যথেষ্ট নয়; মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনটি লক্ষ্য পূরণে জৈব সার একটি অত্যন্ত কার্যকর ও প্রাকৃতিক সমাধান। রাসায়নিক সারের তুলনায় জৈব সার ধীরে কাজ করলেও এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী এবং পরিবেশবান্ধব।

জৈব সার মাটির উর্বরতা প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধি করে। এতে থাকা জৈব পদার্থ মাটির গঠন উন্নত করে, ফলে মাটি ঝুরঝুরে হয় এবং শিকড় সহজে বিস্তার লাভ করতে পারে। একই সঙ্গে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ে, যা খরা বা অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় ফসলকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। দীর্ঘদিন রাসায়নিক সার ব্যবহারে যেখানে মাটি শক্ত ও অনুর্বর হয়ে যায়, সেখানে জৈব সার মাটিকে জীবন্ত রাখে।

জৈব সার ব্যবহারে মাটির উপকারী অণুজীব সক্রিয় থাকে। এই অণুজীবগুলো গাছের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সহজে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। ফলে গাছ ধীরে কিন্তু শক্তভাবে বেড়ে ওঠে। এটি শুধু ফলন বাড়ায় না, বরং গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে।

নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য উৎপাদনের জন্য জৈব সার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জৈব সার ব্যবহারে উৎপাদিত ফসলে ক্ষতিকর রাসায়নিক অবশিষ্ট থাকে না। ফলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে এবং খাবারের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ উন্নত হয়। বিশেষ করে শাকসবজি ও ফল চাষে জৈব সার ব্যবহারের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও জৈব সারের ভূমিকা অপরিসীম। রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত হয়। অন্যদিকে জৈব সার পরিবেশবান্ধব এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। এটি ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ কমায় এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও জৈব সার গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক নিজেই খামারের বর্জ্য বা জৈব উপাদান ব্যবহার করে সার তৈরি করতে পারেন, যা উৎপাদন খরচ কমায়। দীর্ঘমেয়াদে জমির উৎপাদন ক্ষমতা বজায় থাকায় অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের প্রয়োজনও কমে যায়।

জৈব সারের প্রকারভেদ

জৈব সার বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলোঃ
  • গোবর সার - গবাদি পশুর গোবর পচিয়ে তৈরি করা সবচেয়ে পরিচিত জৈব সার।
  • কম্পোস্ট সার - পাতা, খড়, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট পচিয়ে তৈরি করা সার।
  • সবুজ সার - কিছু বিশেষ ফসল জমিতে চাষ করে পরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
  • ভার্মি কম্পোস্ট - কেঁচোর মাধ্যমে তৈরি উন্নতমানের জৈব সার।  
জৈব সার বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস থেকে তৈরি হয় এবং প্রতিটি জৈব সারের বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার পদ্ধতি আলাদা। জমির ধরন, ফসলের প্রয়োজন এবং পরিবেশ অনুযায়ী সঠিক জৈব সার নির্বাচন করলে সর্বোচ্চ উপকার পাওয়া যায়। নিচে জৈব সারের প্রধান প্রকারভেদ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

সবচেয়ে প্রচলিত জৈব সার হলো গোবর সার। গরু, মহিষ বা অন্যান্য গবাদি পশুর গোবর ভালোভাবে পচিয়ে এই সার তৈরি করা হয়। গোবর সার মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ায় এবং জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। এটি ধীরে ধীরে পুষ্টি সরবরাহ করে বলে দীর্ঘমেয়াদে জমির জন্য খুবই উপকারী। ধান, গম, সবজি ও ফল গাছে গোবর সার ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

কম্পোস্ট সার হলো গাছের শুকনো পাতা, খড়, আগাছা, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট ইত্যাদি পচিয়ে তৈরি করা জৈব সার। এই সার মাটির গঠন উন্নত করে এবং শিকড়ের বৃদ্ধি সহজ করে তোলে। কম্পোস্ট সার সবজি ও বাগান চাষে অত্যন্ত কার্যকর। এটি পরিবেশবান্ধব এবং সহজেই ঘরে বা খামারে তৈরি করা যায়।

আরেকটি উন্নতমানের জৈব সার হলো ভার্মি কম্পোস্ট। কেঁচোর মাধ্যমে জৈব বর্জ্য পচিয়ে এই সার তৈরি করা হয়। ভার্মি কম্পোস্টে পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি এবং গাছ দ্রুত তা গ্রহণ করতে পারে। সবজি, ফুল ও ফল গাছের জন্য এটি খুবই উপযোগী।

সবুজ সার জৈব সারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকার। এ ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট ফসল যেমন ধৈঞ্চা, সানহেম্প বা কলাই চাষ করে পরে সেগুলো জমির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এতে মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং জমি উর্বর হয়। ধান চাষের আগে সবুজ সার ব্যবহার বিশেষভাবে উপকারী।

তেলখোল ও খৈল সার হলো সরিষা, তিল বা অন্যান্য তেলবীজ থেকে তেল নিষ্কাশনের পর অবশিষ্ট অংশ। এই সার পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং গাছের বৃদ্ধি দ্রুততর করে। ফল গাছ ও সবজি চাষে এটি ভালো ফল দেয়।

জৈব তরল সার যেমন গোবরের মিশ্রণ বা জৈব নির্যাসও বর্তমানে জনপ্রিয়। এটি গাছের পাতায় বা মাটিতে ব্যবহার করা হয় এবং দ্রুত পুষ্টি সরবরাহ করে।

জৈব সার ব্যবহারের নিয়ম

প্রথমত, জমি চাষের আগে জৈব সার জমিতে ছিটিয়ে ভালোভাবে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে নিতে হবে। এতে সার সহজে পচে গাছের জন্য উপযোগী হয়।

দ্বিতীয়ত, ভালোভাবে পচানো সার ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। কাঁচা গোবর বা অপরিপক্ব সার ব্যবহার করলে গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তৃতীয়ত, ফসল ও জমির ধরন অনুযায়ী সারের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। অতিরিক্ত জৈব সার ব্যবহারে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।

চতুর্থত, নিয়মিত ব্যবহারে জৈব সার সবচেয়ে ভালো ফল দেয়। একবার ব্যবহার করলেই ফল পাওয়া যাবে - এমন ধারণা ঠিক নয়। 

কোন ফসলে কীভাবে জৈব সার ব্যবহার করবেন?

সব ফসলের জন্য জৈব সার ব্যবহারের পদ্ধতি এক নয়।ধান ও গমের ক্ষেত্রে জমি প্রস্তুতির সময় জৈব সার ব্যবহার করা ভালো।সবজি চাষে চারা রোপণের আগে ও গাছ বড় হওয়ার সময় জৈব সার প্রয়োগ করা যায়।ফল গাছের ক্ষেত্রে বছরে এক বা দুইবার গাছের গোড়ায় জৈব সার দেওয়া উপকারী।

জৈব সার ব্যবহারের সঠিক ফল পেতে হলে সব ফসলে এক নিয়মে সার প্রয়োগ করলে হবে না। ফসলের ধরন, গাছের বৃদ্ধি পর্যায় এবং জমির অবস্থার ওপর ভিত্তি করে জৈব সার ব্যবহার করতে হয়। সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করলে ফসল যেমন স্বাস্থ্যকর হয়, তেমনি জমির উর্বরতাও দীর্ঘদিন বজায় থাকে।
জৈব-সার-কাকে-বলে

ধান, গম ও অন্যান্য শস্য ফসলের ক্ষেত্রে জমি প্রস্তুতির সময় জৈব সার ব্যবহার সবচেয়ে কার্যকর। চাষের আগে প্রতি বিঘা জমিতে নির্ধারিত পরিমাণ ভালোভাবে পচানো গোবর সার বা কম্পোস্ট সার ছিটিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে নিতে হয়। এতে ধীরে ধীরে পুষ্টি সরবরাহ হয় এবং শস্যের শিকড় মজবুত হয়। শস্য ফসলে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ না করে নিয়মিত ও পরিমিত ব্যবহার করাই উত্তম।

সবজি চাষে জৈব সার ব্যবহারে একটু বেশি যত্ন নেওয়া দরকার। চারা রোপণের আগে জমিতে কম্পোস্ট বা ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করলে গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে। এছাড়া গাছ বড় হওয়ার সময় গাছের গোড়ার চারপাশে অল্প পরিমাণ জৈব সার প্রয়োগ করা যায়। এতে ফলন বাড়ে এবং সবজির স্বাদ ও পুষ্টিগুণ উন্নত হয়। কাঁচা বা অপরিপক্ব সার সবজি ক্ষেতে ব্যবহার করা উচিত নয়।

ফল গাছের ক্ষেত্রে জৈব সার সাধারণত বছরে এক বা দুইবার ব্যবহার করা হয়। গাছের বয়স অনুযায়ী গাছের গোড়ার চারদিকে মাটি কুপিয়ে ভালোভাবে পচানো গোবর সার বা কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করা হয়। বর্ষার আগে ও শীতের শেষে জৈব সার দেওয়া সবচেয়ে উপকারী। এতে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয় এবং ফলের আকার ও গুণমান বৃদ্ধি পায়।

ডাল ও তেল জাতীয় ফসলের ক্ষেত্রে জৈব সার জমির উর্বরতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব ফসলে জমি প্রস্তুতির সময় হালকা মাত্রায় জৈব সার ব্যবহার করলেই ভালো ফল পাওয়া যায়। বেশি সার ব্যবহার করলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, তাই পরিমিত ব্যবহার জরুরি।

ফুল ও বাগানজাত গাছের জন্য ভার্মি কম্পোস্ট বা কম্পোস্ট সার খুবই কার্যকর। নিয়মিত অল্প অল্প করে সার প্রয়োগ করলে গাছ সুস্থ থাকে এবং ফুল বেশি আসে। টবের গাছের ক্ষেত্রে মাসে একবার জৈব সার দেওয়াই যথেষ্ট।

জৈব সার ব্যবহারের সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা

জৈব সার ব্যবহারের অনেক সুবিধা থাকলেও  কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

সুবিধা

  • জৈব সার পরিবেশবান্ধব, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে এবং দীর্ঘমেয়াদে ফলন স্থিতিশীল রাখে।
  • জৈব সার ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট না করে বরং উন্নত করে। জৈব সার মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ায়, ফলে মাটি ঝুরঝুরে ও উর্বর হয়। এতে গাছের শিকড় সহজে বিস্তার লাভ করতে পারে এবং গাছ শক্তভাবে বেড়ে ওঠে।
  • জৈব সার ব্যবহারে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে খরার সময় জমিতে আর্দ্রতা ধরে রাখা সহজ হয় এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিতেও মাটি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। এটি ফসলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব থেকে আংশিকভাবে রক্ষা করে।
  • এই সার পরিবেশবান্ধব ও দূষণমুক্ত। রাসায়নিক সারের মতো জৈব সার মাটি, পানি বা বায়ু দূষণ করে না। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং উপকারী জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায়।
  • জৈব সার ব্যবহারে ফসলের গুণগত মান উন্নত হয়। জৈব সার থেকে উৎপাদিত শাকসবজি ও ফল স্বাদে ভালো হয় এবং পুষ্টিগুণ বেশি থাকে। পাশাপাশি এতে ক্ষতিকর রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ থাকে না, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ।
  • জৈব সার গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। মাটিতে থাকা উপকারী অণুজীব সক্রিয় থাকায় গাছ সহজে রোগাক্রান্ত হয় না এবং প্রাকৃতিকভাবে সুস্থ থাকে। 
  • অর্থনৈতিক দিক থেকেও জৈব সার লাভজনক। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষক নিজের খামার বা বাড়ির জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে জৈব সার তৈরি করতে পারেন, এতে সারের খরচ কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে জমির উর্বরতা বজায় থাকায় অতিরিক্ত সার ব্যবহারের প্রয়োজনও কম হয়।
  • সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, জৈব সার টেকসই কৃষিকে উৎসাহিত করে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উর্বর জমি, নিরাপদ খাদ্য ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

সীমাবদ্ধতা

১) যদিও জৈব সার পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষির জন্য উপকারী, তবুও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা জানা জরুরি। এসব সীমাবদ্ধতা বুঝে ব্যবহার করলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।

২) জৈব সারের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি ধীরে কাজ করে। রাসায়নিক সারের মতো দ্রুত ফলন বৃদ্ধি ঘটাতে পারে না। ফলে যারা স্বল্প সময়ে বেশি ফলন আশা করেন, তাদের জন্য জৈব সার একা যথেষ্ট নাও হতে পারে।

৩) জৈব সার প্রস্তুত করতে সময় লাগে। গোবর, কম্পোস্ট বা অন্যান্য জৈব সার ভালোভাবে পচাতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হয়। এই সময়ের অভাবে অনেক কৃষক জৈব সার ব্যবহারে আগ্রহ হারান।

৪) এই সারে পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম এবং অনির্দিষ্ট। ফলে জমি ও ফসল অনুযায়ী সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত বা অপর্যাপ্ত ব্যবহার করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।

৫) জৈব সার পরিবহন ও সংরক্ষণে ঝামেলা বেশি। আকারে বড় ও ভারী হওয়ায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া কষ্টসাধ্য এবং খরচও বেড়ে যায়। বিশেষ করে বড় আকারের চাষাবাদের ক্ষেত্রে এটি একটি সমস্যা।

৬) সব জায়গায় সমানভাবে জৈব সার পাওয়া যায় না। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত জৈব উপাদান বা কাঁচামালের অভাব থাকায় জৈব সার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

৭) অপরিপক্ব বা ভালোভাবে পচানো না হলে জৈব সার ক্ষতিকরও হতে পারে। কাঁচা গোবর বা অপরিশোধিত সার ব্যবহার করলে গাছের শিকড় পুড়ে যেতে পারে এবং রোগজীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।

আমাদের মন্তব্য

জৈব সার কাকে বলে এবং জৈব সার ব্যবহারের নিয়ম জানার মাধ্যমে আমরা শুধু ভালো ফলনই নয়, বরং নিরাপদ খাদ্য ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি। সঠিক নিয়মে জৈব সার ব্যবহার করলে জমি থাকবে উর্বর, ফসল হবে স্বাস্থ্যকর এবং কৃষি হবে টেকসই।

এই পুরো পোস্টটি মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আশা করি তথ্যগুলো আপনার জন্য উপকারী হয়েছে এবং বাস্তব কাজে লাগবে। এমন আরও নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ কৃষি, স্বাস্থ্য ও সচেতনতামূলক পোস্ট পেতে আমাদের সাথেই থাকুন এবং নিয়মিত ফলো করুন। আপনার সমর্থনই আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আপনার মতামত আমাদেরকে সাহায্য করবে আরো সুন্দরভাবে আপনাদের সেবা দেওয়ার জন্যে ।

comment url